কীর্তিমানদের মৃত্যু নেই। তাদের চলে যাওয়া মানে শারীরিক প্রস্থান কেবল। সাফল্যে ভরা কর্মই তাদের বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল। তেমনই এক কীর্তিমানের নাম আইয়ুব বাচ্চু। ছিলেন দেশীয় ব্যান্ডসংগীতের এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব। শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ড এলআরবির দলনেতা, ভোকাল এবং লিড গিটারিস্ট। গিটার বাজানোর ক্ষেত্রে অনন্য স্টাইল এবং নান্দনিক দক্ষতাগুণে ‘গিটার লিজেন্ড’ খ্যাতিটি তার নামের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল অনেকদিন আগেই। প্রিয় যে কোনো একটি গিটার কাঁধে ঝুলিয়ে তিনি যখন মঞ্চে এসে দাঁড়াতেন তখন দর্শক সারিতে তুমুল আনন্দ, মুহুর্মুহু করতালি এবং তার নাম ধরে চিৎকার করে করে সীমাহীন উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো।

তিনি যখন তার গিটারে সুর তুলতেন তখন দর্শক সারির সে উত্তেজনা রূপ নিতো চরম উন্মাদনায়। আর গিটারের তালে তালে তার কণ্ঠে যখন উচ্চারিত হতো গান তখনতো কথাই ছিল না। দর্শকদের আনন্দ যেন আর ধরতো না। তিনি, তার গিটার, গান আর দর্শক মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতেন। ভক্তকুলের ওপর এমন মায়াময় প্রভাব বিস্তারকারী মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই। গেল বছরের এই দিনে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। আইয়ুব বাচ্চুকে ‘কমপ্লিট মিউজিক পারসোনালিটি’ও বলা হতো। কারণ তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, সব সংগীত যন্ত্র বাজানো ও গান রেকর্ডিং, মিক্সিং, মাস্টারিংয়ে সমান পারদর্শী ছিলেন। বলা যায় একটি গান তৈরির পুরোটাই নিজ হাতে সারতে পারতেন অনায়াসে। আর এ কারণে তার সৃষ্ট যে কোনো গানই পেতো অসাধারণ রূপ। যা দেশের সংগীত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি তুমুল শ্রোতাপ্রিয়তাও লাভ করতো। অ্যালবামের জন্য গান করার পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলেও ছিল তার নিয়মিত এবং দাপুটে বিচরণ। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জিঙ্গেল তৈরির পাশাপাশি কয়েকটিতে কণ্ঠও দিয়েছেন তিনি। যেগুলোর প্রায় সবই পেয়েছে ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা। আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম চট্টগ্রামে। সেখানেই শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের কিছুটা কাটে তার। একসময় সংগীতে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় স্থায়ী হন। ১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘এলআরবি’। এর আগে তিনি দশ বছর ‘সোলস’ ব্যান্ডের সঙ্গে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সংগীতজগতে তার যাত্রা শুরু হয় ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে। গুণী এই শিল্পী তার শ্রোতা-ভক্তদের কাছে এবি (অই) নামেও পরিচিত। তার ডাক নাম রবিন। মূলত রক ঘরানার কণ্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক গান, ক্ল্যাসিকাল সংগীত এবং লোকগীতি দিয়েও শ্রোতাদের মুগ্ধ করায় দারুণ পারদর্শী ছিলেন তিনি। আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠ দেয়া প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প বলি’। এটি সোলস ব্যান্ডে থাকাকালীন গেয়েছিলেন তিনি। তার প্রথম প্রকাশিত একক অ্যালবামের নাম ‘রক্তগোলাপ’। যেটি প্রকাশ পায় ১৯৮৬ সালে। তার দ্বিতীয় একক অ্যলবাম ‘ময়না’ প্রকাশ পায় ১৯৮৮ সালে। বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পায় অ্যালবামটি। ১৯৯৫ সালে তিনি বের করেন তার তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’। সর্বকালের সেরা একক অ্যালবামের একটি বলে অভিহিত করা হয় এটিকে। এই অ্যালবামের সবক’টি গানই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ‘কষ্ট’র পর থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তার আরো বেশ কিছু একক অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে। এ ছাড়া ব্যান্ড এলআরবিকে নিয়েও প্রকাশ হয়েছে দুর্দান্ত কিছু অ্যালবাম। যে অ্যালবামগুলোর গান আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি দেশের সংগীত ভাণ্ডারকে করেছে দারুণভাবে সমৃদ্ধ। আইয়ুব বাচ্চু বেশ কিছু বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন। এসবের মধ্যে তার কণ্ঠ দেয়া প্রথম প্লেব্যাক ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ বাংলা ছবির অন্যতম একটি জনপ্রিয় গান। গিটার বাজানোতে তিনি সারা ভারতীয় উপমহাদেশে বিখ্যাত। বিশ্ববরেণ্য গিটারবাদক জিমি হেন্ড্রিক্স, কার্লোস সানতানা এবং জো স্যাট্রিয়ানীর বাজানোয় তিনি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। আইয়ুব বাচ্চুর নিজের একটি স্টুডিও ছিল। ঢাকার মগবাজারে কাজী অফিসের গলিতে ছিল এর অবস্থান। স্টুডিওওটির নাম ছিল ‘এবি কিচেন’। ব্যান্ড এলআরবিকে নিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি। আর সবখানেই নিজেদের জনপ্রিয় গানগুলো পরিবেশন করে সেখানকার শ্রোতা-দর্শকদের মুগ্ধ করার পাশাপাশি দেশের জন্য বয়ে নিয়ে এসেছেন অনেক সম্মান। আইয়ুব বাচ্চু চলে গেছেন এক বছর হয়। কিন্তু এলআরবি ব্যান্ডের অন্য সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের সদস্যদের নানা সিদ্ধান্তের কারণে দেশের শীর্ষস্থানীয় এ ব্যান্ডটি এখন অস্তিত্বহীন প্রায়।

অন্য খবর  বাংলাদেশি ভক্তদের উদ্দেশ্যে ইলুভিটির বার্তা

Comments

comments