কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া না দিতে কেরানীগঞ্জে উপজেলা চেয়ারম্যানের মাইকিং

37

পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন ও কারখানা সরিয়ে কেরানীগঞ্জে নেওয়ার যে প্রক্রিয়া ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন ঠেকাতে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা উঠেছে। মাইকিংয়ের মাধ্যমে বলা হচ্ছে, কোনো কেমিক্যাল গোডাউন ও কারখানার জন্য যেন কেউ দোকান ভাড়া না দেন। এতে বিপাকে পড়েছেন পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা। তারা না পারছেন কেমিক্যাল গোডাউন রাখতে, না পারছে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নিতে। অবিলম্বে এ সমস্যার সমাধান চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সোমবার (৪ মার্চ) পুরান ঢাকার ইসলামবাগ এলাকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ছয়তলা ভবনের নিচ তলায় ক্যালসিয়াম কার্বাইডের বস্তা পাওয়ায় পুরো ভবনের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। বলা হয়, গোডাউনের মালামাল সরিয়ে তারপর সংযোগ নিতে।’ সে অনুযায়ী এরই মধ্যে তারা গোডাউনের মালামাল সরিয়ে নিয়েছেন বলে জানান।

মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘নতুন করে ব্যবসা করার জন্য কেরানীগঞ্জে বাড়ি খুঁজতে গিয়েছিলাম। একটি বাড়ি পেলে কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে তা ভাড়া নিয়ে গোডাউন বানানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রোববার (৩ মার্চ) দিনভর কেরানীগঞ্জ এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। বলা হয়, কোনো বাড়িওয়ালা বেশি টাকার লোভে গোডাউন ভাড়া দেবেন না। কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া দিয়ে ভবনের বাসিন্দাদের জীবনের ঝুঁকিতে ফেলবেন না। যদি কেউ নির্দেশ অমান্য করে গোডাউন হিসেবে বাড়ি ভাড়া দেন, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীনুর রহমানের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

মোহাম্মদ হোসেন আরও বলেন, এখন বলেন, আমরা কোথায় যাব? একদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে ভাড়াটিয়ারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন, অন্যদিকে আমরা মালামাল রাখতে গোডাউন পাচ্ছি না। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসা, অথচ এখন বন্ধ হয়ে আছে। ব্যবসা করতে না পারলে পরিবার নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? একটা ব্যবস্থা তো করে দেবে? এভাবে হলে তো চলবে না!

অন্য খবর  দোহার – নবাবগঞ্জে প্রায় ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দী

একই ধরনের অভিজ্ঞতা চকবাজার এলাকার জুতার কারখানার মালিক হাজী আউয়ালুর রহমান পাভেলেরও। তিনি বলেন, প্লাস্টিকের দানা রাখতে টাস্কফোর্স নিষেধ করেছে। মালামাল সরিয়ে নিতে পাঁচ দিনের সময় পেয়েছি। কিন্তু কেউ বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে না। কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বাড়ি খুঁজতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে মাইকিং শুনতে পাই। বাড়িওয়ালাদের বলা হয়, তারা যেন কেমিক্যাল গোডাউন হিসেবে বাড়ি ভাড়া না দেয়। এরপরেও বেশ কয়েকটি বাড়ি ভাড়ার জন্য খুঁজেছেন। কিন্তু কেউ দিতে রাজি হয়নি।

শাহীন চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া না দিতে মাইকিং করা হয়েছে— এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জের চুন কুঠিয়া এলাকার বাসিন্দা মাজেদ সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত চার-পাঁচ দিন থেকেই এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের যেন কেউ বাসা ভাড়া না দেয়।’

এদিকে, টাস্কফোর্সের অভিযান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আরিফ হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘মেয়র বলেছিলেন ২৯টি দাহ্য পদার্থের কোনোটি পেলেই কেবল ওই ভবনের ইউটিলিটি সার্ভিসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম, ওই ২৯টি পদার্থের বাইরের কিছু পেলেও ভবনের ইউটিলিটি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’

আরিফ হোসাইন বলেন, আমরা মেয়রকে বিষয়টি অবহিত করেছি। তিনি শুধু গোডাউনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বলেছেন এবং আরেকবার বসতে চেয়েছেন। অনেক দিনের ব্যাড প্রাকটিস হয়ে আসছে এখানে। ব্যবসায়ীদের ভুল ছিল, সরকারও তদারকি করেনি। এখন হঠাৎ করে সব সমস্যার সমাধান হবে না। আপাতত শুনছি গোডাউন সরিয়ে ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি ও উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরির জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে। তবে সেটাও কবে হবে, তাও স্পষ্ট করে কেউ কিছু বলছে না।

অন্য খবর  গরু বেচা টাকা হারিয়ে ঈদের আনন্দ মাটি আবুল হোসেনের

কেরানীগঞ্জে মাইকিংয়ের বিষয়ে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের এই নেতা বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই মাইকিং করা হচ্ছে। নতুন করে তো কেউ ভাড়া নিতে পারছেই না। বরং আগে থেকে কেরানীগঞ্জে যাদের গোডাউন ভাড়া নেওয়া ছিল, তারাও নতুন করে মালামাল ঢুকাতে পারছেন না। অচিরেই এ সমস্যার সমাধান চাচ্ছেন কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা। শত বছর ধরে এই ব্যবসা চলে আসছে। একদিনেই তো আর এসব সরানো সম্ভব হবে না। এ জন্য সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান শাহীনুর রহমান বলেন, ‘পুরান ঢাকা থেকে কোনো কেমিক্যাল গোডাউন কেরানীগঞ্জে আসবে না। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যেহেতু কেরানীগঞ্জে আধুনিক সিটি হচ্ছে, অফিস আদালত হচ্ছে, কাজেই কেমিক্যাল গোডাউন বা কারখানা সরানোর জন্য অন্য কোনো জায়গা বেছে নেওয়া হবে। আপাতত জুরাইনের উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরির জায়গায় কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়া হবে।’

গোডাউন ভাড়া না দিতে এলাকায় মাইকিং করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এই উপজেলা চেয়ারম্যান বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে এরকম কোনো মাইকিং করা হয়নি।’ ‘আপনি নিজে শুনেছেন?’— বলে পাল্টা প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, অন্যের কথা বিশ্বাস করবেন না।

Comments

comments