ঐতিহ্য ভেঙে এবার সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব ছাত্রদলে

48

সংগঠনটির ইমেজ ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক যোগ-বিয়োগ আর হিসাব-নিকাশে নেতৃত্ব পর্যায়ে ঢেলে সাজানোর চিন্তাভাবনা চলছে। এজন্য দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে এবার সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব আনার চিন্তা করছে বিএনপি, যেখানে কমিটির উচ্চ পর্যায়ের দুটি পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের কেউ দায়িত্ব পেতে পারেন। এমনটাই বলছে বিএনপির সূত্রগুলো।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। নতুন কমিটি গঠনে দেরির কারণে সংগঠনের নেতাকর্মীরা খানিক অস্থির হয়ে উঠলেও ‘ভালো কিছুর প্রত্যাশায়’ কমিটি গঠনের গ্রিন সিগনাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সময় নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই ধরনের কমিটি গঠনের চিন্তা ভাবনা রয়েছে দলে। মনে করা হচ্ছে, এতে সংগঠনটির কর্মকাণ্ডে যেমন গতি বাড়বে, তেমনি নেতৃত্বও বিকেন্দ্রীকরণ হবে। আর অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ভালো নেতৃত্বও উঠে আসবে। ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বরাবরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দু’একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে এটিই হয়ে আসছে। তবে এবার সেই ধারায় পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে। ছাত্রদলের ভেতরেও এই দাবি জোরালো হচ্ছে। তাই এবার নতুন কমিটিতে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদের মধ্যে একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিকে এবং অন্যটি আরেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে দেওয়া হতে পারে।

ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত দুটি সরকার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে যে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতাকর্মীদের সক্রিয় দেখা গেছে, তার মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার হাতে গোনা দু’একটি কলেজের ভুমিকা রয়েছে। অথচ ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা স্বত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠানের নেতারা অতীতে সুপার ফাইভে এসেছেন এমন ঘটনা বিরল। অন্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তাই। এই ধারার পরিবর্তন চান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, সুপার ফাইভে অন্তত একটি পদ হলেও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি রাখা উচিত। এতে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকেও ভালো নেতৃত্ব উঠে আসবে।

অন্য খবর  পল্টনে হরতাল সমর্থকদের রাস্তা অবরোধ

সূত্র বলছে, আগামী ১ জানুয়ারি ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই নতুন নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে সংগঠনটি। সভাপতি, সহ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক এই ‘সুপার ফাইভ’ কমিটি হচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর থেকে বেহাল থাকা ছাত্রদলে প্রাণ ফেরাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা নেতাকর্মীদের মাঝে মাইলফলক হয়ে থাকবে। আগামী একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রদলের এই নতুন কমিটি গঠনকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে এক বছরেরও বেশি সময় চলে গেলেও নতুন কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা ঘটছে।

ছাত্রদল নেতাকর্মীরা বলছেন, ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করা, বয়স্কদের নিয়ে কমিটি গঠন, কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেন, ঐক্যের অভাবসহ অনেক কারণে প্রতিষ্ঠার ৩৯ বছরেও ‘বিএনপির ভ্যানগার্ড’ খ্যাত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অবস্থা এখন নাজুক। সংগঠনটিকে বাঁচাতে নতুন নেতৃত্ব আসার আগে তাই মাঠের নেতাদের বায়োডাটা পরখ করে কমিটি দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তারা।

কেমন কমিটি দেখতে চান জানতে চাইলে ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে পদপ্রত্যাশী নেতা ওমর ফারুক মুন্না রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রদলের এবারের কমিটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে যারা মাঠে থেকেছেন, সংগ্রাম করেছেন, জেল খেটেছেন, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেও মাঠ ছাড়েননি, তাদেরকে সংগঠনের দায়িত্ব দিতে হবে। আমি নিজেও একাধিকবার কারাগারে গিয়েছি, জেল খেটেছি। দলের যে কোনো দায়িত্ব পালনে প্রতিকূল পরিবেশও বিবেচনায় নেইনি।’

ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্ব আনার আগে পদপ্রত্যাশীদের মাঠের রাজনীতির কথা বিবেচনায় নেওয়ার জন্য বিএনপির হাইকমান্ডের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

পদপ্রত্যাশী আরেক নেতা ভিপি কামাল বলেন, ‘ছাত্রদলে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে কে কতটা কর্মীবান্ধব, মাঠে কতটা সময় দিচ্ছেন এবং সর্বোপরি সংগঠনের জন্য কতটা ঘাম ঝরিয়েছেন; সেগুলো বিবেচনায় রাখার অনুরোধ জানাচ্ছি। সেক্ষেত্রে আমি নেতৃত্ব পেলে কমিটি পুর্নাঙ্গ করার ক্ষেত্রে ত্যাগীদের পদ দিতে জিরো টলারেন্স নীতিতে অবস্থান রাখবো।’

অন্য খবর  পুলিশ আর আওয়ামী লীগ মিলেমিশে একাকার : রিজভী

এর আগে ছাত্রদলের বেহাল কাটাতে ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাজিব আহসানকে সভাপতি ও মো. আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫৩ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। বেধে দেওয়া সময়সীমা পার হওয়ারও অনেক পরে ৭৩৪ জনকে পদায়ন করে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হলেও তা নিয়ে রীতিমতো সমালোচনার ঝড় ওঠে। ছাত্রদলের ইতিহাসে এতো বড় কমিটি আর কখনো হয়নি। রাজীব-আকরামের কমিটিকে বলা হচ্ছে, ছাত্রদলের অন্যতম ব্যর্থ কমিটি। ছাত্রদলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই কমিটি দিয়ে সংগঠনটির নেতৃত্ব যেমন সমালোচনার মুখে পড়ে, তেমনি সিনিয়র-জুনিয়রের ভারসাম্য ঠিক না রাখা এবং যোগ্য ও ত্যাগীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ ওঠে। এতে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

এদিকে মেয়াদোত্তীর্ন কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের জন্যে প্রায় প্রতিদিনই শোডাউন-মিছিল মিটিং করছেন পদপ্রত্যাশী নেতারা। সংগঠনটির নেতা-কর্মীরাও চান দ্রুত নতুন কমিটি গঠনের পাশাপাশি এতে যোগ্য ও মাঠে সক্রিয় নেতাদের মূল্যায়ন হোক। আগামী একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির হাইকমান্ড ছাত্রদলে নেতৃত্ব নির্বাচনে ভুল করলে এর সুদুরপ্রসারী মাশুল দিতে হতে পারে বলে মনে করছেন সংগঠনটির নেতারা।

ছাত্রদলের আগামী কমিটিতে শীর্ষ পদের জন্য বেশি আলোচনায় আছেন মামুনুর রশিদ মামুন, আলমগীর হাসান সোহান, নাজমুল হাসান, ভিপি কামাল, আবু আতিক আল হাসান মিন্টু, আসাদুজ্জামান আসাদ, ইসহাক সরকার, ওমর ফারুক মুন্না, মিয়া রাসেল, বায়েজিদ আরেফিন ও মেহেবুব মাসুম শান্ত।

সূত্রঃ রাইজিংবিডি

Comments

comments