এখনই সরকার বিরোধী আন্দোলন নয়

55
বিএনপি

নির্বাচন-পরবর্তী কর্মকৌশল নিয়ে বিএনপি ও তাদের সঙ্গে থাকা জোটভুক্ত দলগুলো এখনো কোনো বৈঠক করেনি। নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলীয় প্রার্থীদের আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় ডেকে পাঠিয়েছে বিএনপি।

তবে নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কিছু সূত্রের সঙ্গে আলোচনা করে বোঝা গেছে, আগামী কয়েক মাস জোটের দলগুলো সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাবে না। বরং সরকার গঠনসহ পরবর্তী পরিস্থিতি দলগুলো আরো কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করবে। আন্দোলনের বদলে প্রচারণা বা গণসংযোগমূলক কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা করবে। পাশাপাশি নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করারও চিন্তা রয়েছে। গতকালই ঢাকা-৮ আসনের  ফলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে। এই আসনে বিএনপির মির্জা আব্বাস পরাজিত হন রাশেদ খান মেননের কাছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঐক্যফ্রন্টভুক্ত একটি দলের প্রধান নেতা বলেছেন, তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় এক লাখ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ট্রাইব্যুনালে মামলা করার চিন্তা করছেন। মামলার আরজিতে বলা হবে যে তাঁরা ভোট দিতে পারেননি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীসহ আরো কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ মুহূর্তে তাঁরা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পক্ষে। পরে সময় অনুকূল মনে হলে আন্দোলনে নামা যাবে।

মওদুদ আহমদ গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘পরবর্তী করনীয় নিয়ে কী করব এর দেরি আছে। এত তাড়াহুড়া নেই। আগামীকালই মানুষ রাস্তায় নামবে এমন নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘লোকজন নামলে তো নির্বাচনের সময় নেমেই যেত। যা হোক, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ঘটনাগুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করব। তারপর ঠিক করব কী করা যায়।’ লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমানও মনে করেন, আগে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। তার পরই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে, কারণ বিশ্বায়নের এই যুগে এটি অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন যেসব নেতৃত্বে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাঁদের দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে।

অন্য খবর  সাভারে এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু

নির্বাচনের পরের দিন ৩১ ডিসেম্বর সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। জানা গেছে, ৩০০ আসনের প্রার্থীরা একযোগে ইসিতে গিয়ে ওই কর্মসূচি পালন করবে। দলগুলো মনে করে, এ ধরনের কর্মসূচি পালন করা হলে জনগণের মধ্যে তা ইতিবাচক সাড়া ফেলবে। একইভাবে ভোট কারচুপির মামলা করা হলেও জনগণ তা গ্রহণ করবে এবং জনমনে ব্যাপক প্রচারণা পাবে বলে মনে করে দলগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আপাতত সরকার বিরোধী কোনো আন্দোলন হবে না বলে ওই দুটি বৈঠকেই আলোচনা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের একজন নেতা দলটির স্থায়ী কমিটির অন্য দুজন  নেতাকে উদ্ধৃত করে জানান, দলের অনেক নেতাই এখন ক্লান্ত। ফলে আপাতত রাজপথে আন্দোলনে না যাওয়ার পক্ষেই তাঁরা মত দিচ্ছেন।

একটি সূত্রের দাবি, ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে উপস্থিত একটি দলের নেতা জামায়াত প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে বলেন যে তাদের মনোনয়ন দেওয়ার ফলেই ভারতের সমর্থন পাওয়া যায়নি। তখন বিএনপির এক নেতা বলেন, জামায়াত ২০ দলীয় জোটে আছে, কিন্তু ঐক্যফ্রন্টে নেই। এরপর ওই আলোচনা আর বেশিদূর এগোয়নি বলে জানা গেছে।

ভোট কারচুপির প্রতিবাদে বিএনপির তৃণমূল একটি অংশ  হরতাল কর্মসূচি দেওয়ার দাবি তুলেছে বলেও জানা গেছে। কিন্তু  বিষয়টি সোমবারে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনার পর তা নাকচ হয়ে যায়।

বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টভুক্ত প্রায় সব দলই মনে করে, আন্তর্জাতিক সমীকরণ না বদলালে শুধু আন্দোলন করে এখন আর বর্তমান সরকারকে চাপে ফেলা যাবে না। বিশেষ করে ভারত ও চীনের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে দলগুলোর মূল্যায়ন। কিন্তু নির্বাচনের পর ওই দুটি দেশই সরকারকে দ্রুত অভিনন্দন জানিয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়েছে যে ওই দুটি দেশের সমর্থন বর্তমান সরকারের দিকে। আর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বললেও সরকারকে খুব বেশি চাপে ফেলতে পারেনি।

অন্য খবর  সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির কাউন্সিল

কূটনৈতিক অঙ্গনে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে বিএনপির এমন একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোই নিয়ামক শক্তি হিসেবে বেশি কার্যকর। জনগণ সেই তুলনায় এখন নিয়ামক শক্তি হিসেবে ততটা কার্যকর নয়—এমন দাবি করে তিনি বলেন, আন্দোলন করে সরকার ফেলে দেওয়া এখন কঠিন কাজ। ফলে বিকল্প কর্মকৌশল নিয়ে ভাবতে হবে।

২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ড. অলি আহমদ অবশ্য জানান, সোমবারের বৈঠকে তিনি ছিলেন না। ঢাকায় ফিরে দলীয় ফোরাম এবং জোটের বৈঠকে আলোচনা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, ভবিষ্যতে করণীয় অনেক কিছু আছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করার কথা অনেকে বলছেন। তা ছাড়া পরিস্থিতি পর্যালোচনারও দরকার আছে। ফলে কর্মকৌশল নির্ধারণে সময় লাগবে।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর ঐক্যফ্রন্টকে সংগঠিত করে অবশ্যই আমরা গণতন্ত্রহীন এই সংকট থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করব।’ তিনি অভিযোগ করেন, আগের রাতে ভোট বাক্স ভরে দিয়ে পরের দিন সকালে আবার কিছু ব্যালট রেখে দিয়ে ভোট নিয়ে সরকার রঙ্গ করেছে। বিশ্ববাসী এবং দেশের জনগণ এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। অবশ্যই উপযুক্ত সময়ে এর প্রতিবাদ করা হবে।

Comments

comments