ইরাকের নির্বাচনে মোকতাদা আল সদর জোটের জয়

51
মোকতাদা আল সদর

ইরাকের সাধারণ নির্বাচনে অভাবিত জয় পেয়েছে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিনবিরোধী হিসেবে পরিচিত জনপ্রিয় ধর্মীয় নেতা মোকতাদা আল সদরের নেতৃত্বাধীন জোট।

মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) পরাজিত করার পর দেশটির প্রথম এ নির্বাচনে তারা শীর্ষস্থান অর্জনের পথে আছে, ৯১ শতাংশের বেশি ভোট গণণা শেষে জানিয়েছে ইরাকের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন।

ইরান সমর্থিত শিয়া হাদি আল-আমিরির নেতৃত্বাধীন জোট দ্বিতীয় ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদির জোট তৃতীয় স্থানে আছে।

দেশটির ১৮টি প্রদেশের মধ্যে ১৬টির ভোট গণণা শেষে এ প্রাথমিক ফল পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

স্থানীয় দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনার কারণে কুর্দি অধ্যুষিত দোহুক ও জাতিগতভাবে মিশ্র, তেলসমৃদ্ধ কিরকুকের ফল আসতে দেরি হলেও তা সদরের অবস্থানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলবে না। এ দুটি প্রদেশে সদরের নেতৃত্বাধীন সাইরুন জোটের কোনো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।

সাদ্দাম পরবর্তী জমানায় এবারই দেশটির সাধারণ নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটের হার ছিল ৪৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।

ভোট গণনার শুরুতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদির পিছিয়ে পড়ার চিত্র স্পষ্ট হয় বলে জানিয়েছে রয়টার্স। প্রথম ১০টি প্রদেশের মধ্যে সদর ও হাদি নেতৃত্বাধীন উভয় জোটই চারটি করে প্রদেশে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেয়। তবে সবচেয়ে বেশি সংসদীয় আসন থাকা রাজধানী বাগদাদে সদর জোট এগিয়ে গেলে মার্কিনবিরোধী জনপ্রিয় এ ধর্মীয় নেতার বিস্ময়কর জয়ের ক্ষেত্রে সব বাধা অপসারিত হয়।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাগদাদের এক প্রার্থীর সরবরাহ করা অনানুষ্ঠানিক ফলে সদরের জোট সারাদেশে ১৩ লাখের বেশি ভোট পেয়েছে বলে জানানো হয়।

অন্য খবর  আবার উ. কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা; আঘাত হানতে সক্ষম মার্কিন ভূখণ্ডে

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা হাদি আল-আমিরির জোট পেয়েছে ১২ লাখেরও বেশি ভোট। আবাদি নেতৃত্বাধীন অংশের বাক্সে গেছে ১০ লাখ ভোট।

ভোটের এ হিসাবে সদর, হাদি ও আবাদি জোট ৩২৯ আসনের সংসদে যথাক্রমে ৫৪, ৪৭ ও ৪২টি আসন পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকির ভাগ্যে জুটতে যাচ্ছে ২৫টির মতো আসন।

অনানুষ্ঠানিক এ ফল সঠিক কি না তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স, যদিও নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ১৬টি প্রদেশের ফলাফলের সঙ্গে এর মিল রয়েছে।

কোনো জোটই এককভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট না পাওয়ায় সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন অংশের মধ্যে দেনদরবারের প্রয়োজন হবে বলেও জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। ফল ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

নতুন সরকারকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে মোকাবেলা করে এগুতে হবে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ২০১৫ সালে তেহরানের সঙ্গে হওয়া ছয় বিশ্বশক্তির ওই চুক্তি থেকে সপ্তাহখানেক আগে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইরাক তেহরান ও ওয়াশিংটনের সংঘাত-সংঘর্ষের মঞ্চে পরিণত হতে পারে বলেও শঙ্কা অনেক ইরাকির।

ইরাকে মার্কিন বাহিনীর হামলার পর তাদের বিরুদ্ধে দুটি বিস্তৃত বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়া সদর হলেন মধ্যপ্রাচ্যের সেই বিরল শিয়া নেতাদের একজন, যার সঙ্গে তেহরানেরও দূরত্ব আছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনি ইরাকে সদর জোটের উত্থানের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।

“উদারপন্থি ও কমিউনিস্টদের ইরাক শাসনের সুযোগ দিতে পারি না আমরা,” সদর এবং তার জোটে থাকা ইরাকের কমিউনিস্ট পার্টি ও ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন তিনি।

অন্য খবর  প্রোফাইল: কর্নেল গাদ্দাফি

নিজেকে ‘জাতীয়তাবাদী’ পরিচয় দেওয়া সদর ইরাকের তরুণ, দরিদ্র এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। এরপরও ইরানের বিরোধীতায় তার জোটের ক্ষমতায় বসা নাও হতে পারে বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের।

২০১০ সালের নির্বাচনে নেতৃত্বাধীন জোট বেশি সংখ্যক আসন জেতার পরও ইরাকের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট আয়াদ আলাউয়ি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। তেহরানই এর জন্য দায়ী ছিল বলে পরে অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

এসব বিবেচনায় তৃতীয় হয়েও দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতে পারেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশেরই বিরল মিত্রদের একজন হায়দার আল আবাদি।  আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর সাহায্য নেওয়া আবাদি জঙ্গিগোষ্ঠীটিকে মোকাবিলায় ইরান সমর্থিত শিয়া আধাসামরিক বাহিনীগুলোকে দেশজুড়ে অবাধে বিচরণেরও সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

সোমবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দলকে ফলাফলের প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। কয়েক বছর ধরে সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ থাকা সদরের সঙ্গে কাজ করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

“ইরাকের জন্য একটি শক্তিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত সরকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা ও কাজ করতে প্রস্তুত আমরা,” বলেন তিনি।

সদর নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম প্রভাবশালী দল ইরাকের কমিউনিস্ট পার্টির ওয়েবসাইটেও অন্যদের চেয়ে ‘আবাদি জোটই সদরের বেশি ঘনিষ্ঠ’ বলে জানানো হয়েছে।

নির্বাচনে ইরাকের জনগণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশকেই ‘স্পষ্ট বার্তা’ দিয়েছে বলেও মন্তব্য ইরাকি কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল রাদ ফাহমীর।

“ইরাককে সহায়তে করতে চাওয়া সব দেশকেই স্বাগত জানানো হবে, তবে সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার দামে নয়,” বলেছেন তিনি।

Comments

comments