আর্জেন্টিনার ফুটবল ‘মেরে’ ফেলেছেন যিনি

63
আর্জেন্টিনার ফুটবল ‘মেরে’ ফেলেছেন যিনি

রাশিয়ায় আর্জেন্টিনার করুণ অবস্থার কারণ বললে প্রথমেই আসবে তাঁদের দুর্বল দল। হ্যাঁ, লিওনেল মেসি, সার্জিও আগুয়েরো, ডি মারিয়ারা ছিলেন বটে। কিন্তু ঘরের সামনের দরজা যতই আঁটসাঁট থাক না কেন, পেছনের দরজা খোলা থাকলে শত্রুপক্ষ এই দুর্বলতার সুযোগই নিতে ওত পেতে থাকবে। আর্জেন্টিনারও হয়েছে সেই দশা। কিন্তু এই দুর্দশা কি হঠাৎ করেই? উত্তর ‘না’।

একটু স্মৃতিচারণ করা যাক, ১৯৭৮ বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে ট্রফি হাতে পুরো মাঠ চক্কর দিচ্ছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক ড্যানিয়েল প্যাসারেলা। আর্জেন্টিনা দল তো বটেই, পুরো দেশই তখন আনন্দে আত্মহারা। তবে সবচেয়ে বেশি খুশি ছিলেন তিনি, হুলিও গ্রন্দোনা। না, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছে এ জন্য নয়, বরং বিশ্বকাপ জেতার হুল্লোড়ের মাঝে গ্রন্দোনা যে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সভাপতির পদ হাতিয়ে নিয়েছেন সেটি রাতারাতি কেউ লক্ষ্য করবে না বলে। গ্রন্দোনার দায়িত্ব নেবার দিন থেকে শুরু, সেই যে দুর্নীতির বীজ ঢুকে গেল আর্জেন্টিনার ফুটবলে, ৪০ বছর ধরে তার রেশ টেনে চলছে দেশটি।

লাতিন আমেরিকান ফুটবলে দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ের মতো বিশ্বকাপ জয়ী দেশের ফেডারেশনগুলোই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। আর্জেন্টিনা আবার তাঁদের মধ্যে শীর্ষে।

তবে আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) হঠাৎ করেই দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়নি। দুর্নীতি ধীরে ধীরে বিষাক্ত গ্যাসের মতো ছড়িয়ে অ্যাসোসিয়েশনের শাখা-প্রশাখায়। আর এর শিরোমণি এএফএ-র সাবেক সভাপতি হুলিও গ্রন্দোনা।

গ্রন্দোনা ছিলেন স্বৈরশাসকের চাক্ষুষ উদাহরণ। ১৯৭৯ সালে সেই যে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সভাপতির পদ দখল করলেন সেটি জীবিত থাকতে ছাড়েননি। ২০১৪ সালে গ্রন্দোনার মৃত্যুর পরই আর্জেন্টিনা ফেডারেশন নতুন সভাপতি নির্বাচন করার সুযোগ পায়। গ্রন্দোনার দুর্নীতির তালিকা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখে ফেলা যাবে। ছোট থেকে বড়, সুযোগ পেলে তিনি নাকি যে কোনো অঙ্কের অর্থ হাতানো বাকি রাখেননি!

গ্রন্দোনার অর্থলিপ্সা এতই বেশি ছিল যে আর্জেন্টিনা দলকে অনেক ছোট দলের সঙ্গেও প্রীতি ম্যাচ খেলতে পাঠিয়েছেন। যেমন ধরুন, বাংলাদেশ ও ভারত। ফুটবলীয় প্রেক্ষাপটে এ দুটি দল কোনো বড় শক্তি নয়। আর্জেন্টিনা দল পাঠানোয় এই দুই দেশের ফুটবলে যে লাভের জোয়ার বয়ে গেছে তাও নয়। বরং যে ‍উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ও ভারত আর্জেন্টিনা দলকে আনতে প্রচুর টাকা খরচ করেছিল সেটি ফিরে এসেছে ‘বুমেরাং’ হয়ে।

অন্য খবর  দোহার নবাবগঞ্জ কেরাণিগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত

আর্জেন্টিনাকে আনতে যে পরিমাণ টাকা বাংলাদেশের খরচ হয়েছে, সেই পরিমাণ টাকা যদি দেশের ফুটবলের প্রতিভা তুলে আনতে ব্যয় করা হতো তাহলেও এত পেছনে থাকত না বাংলাদেশের ফুটবল। অথচ সেই টাকা গিয়ে ঢুকেছিল হুলিও গ্রন্দোনার পকেটে। আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবল থেকেই একসময় বিশ্ব কাঁপানো তারকা ফুটবলাররা উঠে আসতেন। গ্রন্দোনা আসার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। বলা ভালো, বন্ধ করে দেন গ্রন্দোনাই।

গ্রন্দোনা নিজে পুরো আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাঁর পোষ্য বিরাট মাফিয়া বাহিনী ছিল। গ্রন্দোনা প্রতিবছরই নিজের খেয়াল খুশিমতো লিগের নিয়মকানুন বদলাতেন। আর্জেন্টিনার একটি ধনী ও অসাধু মহল এই লিগ নিয়ে বাজি ধরত। সেই বাজির টাকার একটা অংশ পেতেন গ্রন্দোনা। যার ফলে আর্জেন্টাইন লিগের অধিকাংশ ম্যাচের ফলাফল নির্ধারিত হতো গ্রন্দোনার নির্দেশ অনুযায়ী।

আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগ ও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের খেলা সম্প্রচার স্বত্ব ২০১০ সাল থেকে পেয়েছে টিওয়াইসি স্পোর্টস। গ্রন্দোনা দুর্নীতির করতে ছাড়েননি এখানেও। টিওয়াইসি স্পোর্টসের মালিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রন্দোনার ভালো সম্পর্ক থাকার দরুন তারা সম্প্রচার স্বত্ব পায়। প্রশ্ন হলো, তাতে গ্রন্দোনার লাভ কী ছিল? সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়ার জন্য গ্রন্দোনাকে ২৫ মিলিয়ন ডলার ঘুষ দিয়েছিল টিওয়াইসি স্পোর্টস। অথচ সম্প্রচার স্বত্ব হতে পাওয়া অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা ছিল আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলের উন্নয়নে।

সেই উন্নয়ন তো হয়নি, উল্টো দিনদিন নিচে নেমেছে আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগের মান। যে লিগ থেকে দুর্দান্ত সব খেলোয়াড় উঠে এসেছেন সেই লিগই এখন প্রতিভার অভাবে ঊষর মরুভূমি। দলগুলোর আয়ের উৎস ছিল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু অ্যাসোসিয়েশন দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় দলগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখতে অন্য ব্যবস্থা নিল। সেটি হলো ইউরোপের ক্লাবগুলোতে কমবয়সী প্রতিভাবান খেলোয়াড় বিক্রি।

১৮-১৯ বছর বয়সী দারুণ সব প্রতিভা আর্জেন্টিনা থেকে ইউরোপে গিয়ে মানিয়ে নিতে না পেরে ঝরে যাচ্ছে। অথচ এই খেলোয়াড়দের থাকার কথা ছিল আর্জেন্টিনার বড়বড় ক্লাবগুলোর অধীনে। সেখানে পরিণত হওয়ার পরই ইউরোপে পাড়ি জমানো ভালো ছিল। কিন্তু গ্রন্দোনার দুর্নীতির কালো হাত তা হতে দেয়নি।

অন্য খবর  ব্রাজিলের ভরসা পুরনোরাই

একটা তথ্য দিলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হবে। রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের গড় বয়স অনুযায়ী আর্জেন্টিনা দলই ছিল সবচেয়ে বুড়ো। খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল ৩০.২ বছর। অর্থাৎ তরুণ প্রতিভারা উঠে না আসায় পুরোনো মরচে ধরা সৈনিকদের ওপরই আস্থা রাখতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। সেই আস্থার প্রতিদান যে তাঁরা দিতে পারেননি সে জন্য তাঁদের খুব বেশি দোষ দেওয়ার কিছু নেই।

১৯৮৯ সালে ফিফার সহসভাপতি নির্বাচিত হন গ্রন্দোনা। নিজের পাপের বীজ সেখানেও বুনে দেন তিনি। ২০১৬ সালে ফিফার ঊর্ধ্বতন ৪০ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে একটি অনুসন্ধানী সংস্থা। সেই অনুসন্ধানের শীর্ষে যে গ্রন্দোনাই ছিলেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মৃত্যুর পরেও দুর্নীতির শীর্ষে ছিলেন তিনি, এ থেকেই বোঝা যায় জীবিত থাকাকালীন কি পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন গ্রন্দোনা।

গ্রন্দোনা মারা যাওয়ার পরেও যে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন বদলে গিয়েছে তা নয়। গ্রন্দোনার মৃত্যুর পর আর্জেন্টিনা ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন মার্সেলো তিনেল্লি। তিনিও ধোঁয়া তুলসী পাতা ছিলেন না। গ্রন্দোনার দেখানো পথ ধরেই নির্বাচিত হওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় দুর্নীতির দায়ে পদত্যাগ করতে হয় তিনেল্লিকে।

এরপরের সভাপতি নির্বাচনে ঘটে এক অদ্ভুত কাণ্ড। এমনকি লিওনেল মেসিও ফুটবল মাঠে এই ধরনের অদ্ভুত ঘটনার জন্ম দিতে পারবেন কিনা সন্দেহ। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের সদস্য হলেন ৭৫ জন। ভোট শেষে দেখা যায় দুই প্রার্থী লুইস সেগুরা ও মার্সেলো তিনেল্লি দুজনই পেয়েছেন ৩৮টি করে ভোট। মোট ভোট ৭৬ টি!

দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় আবারও ভোটাভুটির প্রস্তাব দেওয়া হয়। এবার সভাপতি নির্বাচিত হন ক্লদিও তাপিয়া। তাপিয়া নির্বাচিত হয়েও যে আর্জেন্টিনা ফুটবলকে উদ্ধার করে ফেলেছেন তেমনটি ভাবার অবকাশ নেই। ‘যেই লাউ সেই কদু’তেই রয়েছে আর্জেন্টিনার ফুটবল।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বেশি দূর যেতে পারেনি সেটি যতটা না তাঁদের দলের ব্যর্থতা তার চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের। বিশ্বকাপ জেতার মতো একটি শক্তিশালী দল গড়তে যে পাইপলাইন, সেই ঘরোয়া ফুটবলের কঙ্কালসার অবস্থাই এর জন্য দায়ী। আর এই অবস্থা সৃষ্টি করে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ দায়ভার হুলিও গ্রন্দোনার।

Comments

comments