আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে এক যুগ পর ফাইনালে ব্রাজিল

11
ব্রাজিল

মাঠের মাঝখানে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মেসির এই ছবিটা নতুন কিছু নয়। সেই ছবিটাই আরও একবার দেখলো বেলো হরিজন্তে। ব্রাজিলের উল্লাস একপাশে, অন্যপাশে মুষড়ে পরা আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়েরা। এই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সংশয় ছিল অনেক। কোপায় আগের চার ম্যাচে নড়বড়ে আর্জেন্টিনা এদিন রাতারাতি বদলে গিয়েছিল ব্রাজিলের বিপক্ষে। কিন্তু সেই বদলটাও যথেষ্ট হয়নি ব্রাজিলের সামনে। ১৯ আর ৭১ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল হেসুস আর রবার্তো ফিরমিনো দুই গোল দিয়ে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছেন। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই তাই এক যুগ পর ব্রাজিল উঠে গেছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে। এই ম্যাচের পর সঙ্গে একটা রেকর্ডও অক্ষুণ্ণ থেকেছে তিতের দলের, এখনও পর্যন্ত কোনো গোলই হজম করেনি ব্রাজিল।

ব্রাজিলের সেমিফাইনাল জয়ের নায়ক হেসুস ও ফিরমিনো। এক গোলের পাশাপাশি, দুইজনই করেছেন একটি করে অ্যাসিস্ট। আর্জেন্টিনাও অবশ্য গোলের কাছকাছি গিয়েছিল দুইবার। দুইবারই বারপোস্টে ভাগ্য বাধা পেয়েছে লা আলবিসেলস্তেদের। তাই আর ইতিহাস বদলানো হয়নি লিওনেল মেসিদের। ঘরের মাঠে কোপায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অপরাজিতই থাকল ব্রাজিল। আর সেমিফাইনাল থেকে ফাইনালে যাওয়ার শতভাগ রেকর্ডটা আর্জেন্টিনা হারালেও, সেটা ছয়ে নিয়ে গেছে সেলেসাওরা।

এই মাঠেই ২০১৪ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে হারের স্মৃতি মাথায় রেখে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নেমেছিল ব্রাজিল। আগের ম্যাচ থেকে ব্রাজিল কোচ তিতে দুইটি পরিবর্তন এনেছিলেন একাদশে, কাসেমিরো ফিরেছিলেন, আর অ্যালেক্স সান্দ্রো খেলেছেন আনফিট ফিলিপে লুইসের জায়গায়। শুরুটাও অনুমিত ছিল ব্রাজিলের। প্রথম দশ মিনিটে বেশ তোড় জোড় নিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিল তারা। তোড় জোড় ছিল আর্জেন্টিনার রক্ষণেও। ৯ মিনিটে হেসুসকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখে ফেলেন নিকোলাস টালিয়াফিকো। সেটা পরে আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ বাড়িয়েছিল। কিন্তু লিয়ান্দ্রো পারেদেস যখন ১২ মিনিটে ডিবক্সের বাইরে থেকে দারুণ এক শট নিলেন তখন থেকেই বোধ হয় আর্জেন্টিনা টের পেয়ে গিয়েছিল এই রক্ষণ ভাঙা অসম্ভব হবে না হয়ত! পারেদেসের শট অল্পের জন্য চলে যায় বাইরে দিয়ে।

এই দুইদল কোপায় সবশেষ একে অপরের বিপরীতে খেলেছিল ২০০৭ সালে। সে ম্যাচে গোল করেছিলেন দানি আলভেজ। এখন তার বয়স ৩৫, দলের অধিনায়কও তিনি। বুড়িয়ে গেলেও আলভেজের সামর্থ্য যে কমে যায়নি সেটার প্রমাণ রাখলেন তিনি শুরুতেই। ১৯ মিনিটে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড থেকে বল দখল করলেন, এরপর একজন ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে রাইট উইংয়ে থাকা ফিরমিনোকে দিলেন নো লুক পাস। ফিরমিনো ক্রস করলেন গোলের সামনে মাঝামাঝি। ততোক্ষণে আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভেঙে পড়েছে, হেসুস তাই ফাঁকাতেই পেয়ে গেলেন বল। তেমন কোনো চাপও আসলো না, সহজ ট্যাপ ইনে গোল করে ঘরের মাঠে ব্রাজিলের ছন্দ তুলে দিয়েছিলেন হেসুস।

অন্য খবর  বাংলাদেশ সফরও বাতিল করতে পারে অস্ট্রেলিয়া!

কিন্তু ব্রাজিলের আক্রমণের ধার ওখানেই শেষ। এরপর প্রবল চাপ আর ৬৪ হাজার সমর্থকের গলা ফাটানো চিৎকারে মাঠে ফুটবলের চেয়েও শারীরিক সক্ষমতার একটা প্রদর্শনী হয়ে গেছে প্রথমার্ধে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচের স্বাদ বোধ হয় এমনই! তাই মেসিও এদিন স্বরুপেই ফিরলেন।  বেশ কয়েকবার ড্রিবল করে ভালো কিছুর আশা দেখিয়েছিলেন। কাসেমিরোও অবশ্য তাকে কড়া পাহারায় রেখেছেন পুরো ম্যাচে। এরপরও আর্জেন্টিনাই প্রথমার্ধের বাকি সময়ে চাপে রাখলো ব্রাজিলকে। ৩০ মিনিটে মিডফিল্ড থেকে মেসির ফ্রি কিক, সার্জিও আগুয়েরো লাফিয়ে উঠে হেড করলেন ডিবক্সের ঠিক সামনে থেকে। সেটা গোলে পরিণত হতে হতেও গিয়ে লাগলো বারপোস্টের মাথায়। এরপরও গোল পেতে পারতেন আগুয়েরো। কিন্তু বল ড্রপ খেয়ে পড়ল গোললাইনের একটু সামনে। থিয়াগো সিলভা বিপদ আর বাড়তে দেননি ব্রাজিলের। গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করলেন বল সে দফায়।

ব্রাজিল আক্রমণের জন্য বেছে নিয়েছিল ডানদিকটা। টালিয়াফিকোও হলুদ কার্ড দেখে ফেলায় ভুগছিলেন বেশ। আর বাম প্রান্তে তেমন সুবিধা করতে পারেননি এভারটন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তাই তিতের বদল। উইলিয়ান নামলেন তার জায়গায়। বিরতির সময় অবশ্য আরেকটা স্বস্তিও কাজ করছিল ব্রাজিলিয়ানদের। ১৯৭৯ সালের পর কোপার কোনো ম্যাচে শুরুতে এগিয়ে আর হারতে হয়নি ব্রাজিলকে। কিন্তু তিতের দল দ্বিতীয়ার্ধেও খেলার নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারায় বেলো হরিজন্তে একটা সময় অস্বস্তিও ভর করেছিল।

৫৬ মিনিটে দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক দিয়ে হেসুসের থ্রু পাস ধরে ফিলিপ কুতিনিয়োকে নিয়ে গিয়েছিল একেবারে গোলের সামনে। বাধা ছিলেন কেবল ফ্রাঙ্কো আর্মানি। তবে ওই দূরত্ব থেকে আর্মানি কতোটুকু কী করতে পারতেন সেটা নিয়েও ছিল সংশয়। সবকিছু ঠিকঠাক করেও কুতিনিয়ো তখন মারলেন বাইরে দিয়ে। এরপরের মিনিটে কুতিনিয়োকে আফসোস করিয়ে ছাড়িয়ে পারতেন তার ক্লাব সতীর্থ মেসি। ডিবক্সের ভেতর ডানদিক দিয়ে ঢুকে, নেয়ার পোস্টে দারুণ এক ভলি করেছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। অ্যালিসনও হার মেনেছিলেন, কিন্তু হার মানেনি বারপোস্ট। ফিরতি শটে মেসির ক্রস গোললাইনের সামনে দিয়ে গোলের জন্য লোভ জাগিয়ে গেল, কিন্তু তাতে পা ছোঁয়ানোর মতো ছিলেন না আর্জেন্টিনার কেউ।

ম্যাচের ঘন্টা খানেক পার হওয়ার পর আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ‘আর্হেন্তিনা, আর্হেন্তিনা’ স্লোগানটাই তাই ছাপিয়ে যাচ্ছিল ব্রাজিলিয়ানদের দুয়োকে। এরপর লিওনেল স্কালোনিও আগের ম্যাচের মতোই মাঠে নামালেন অ্যানহেল ডি মারিয়াকে। কিন্তু যে আশায় নামিয়েছিলেন তাকে, সে আশায় গুড়েবালি। ডি মারিয়া বেশ কয়েকবার বল পেলেন ঠিকই, কিন্তু কয়টি সঠিক পাস দিতে পারলেন সেটা তাকে জিজ্ঞেস করলে হয়ত ঠিকঠাক বলে দিতে পারবেন।

অন্য খবর  ফ্যাব্রিগাসকে ছাড়াই বিশ্বকাপের স্পেন দল

এর কিছুক্ষণ পর মার্কিনহোস ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছাড়লে তার জায়গায় মাঠে নামেন মিরান্ডা। কিন্তু তাতে ব্রাজিলের রক্ষণের মনোসংযোগে আর ব্যাঘাত ঘটেনি একটুও। মিডফিল্ডে ব্রাজিল বেশ কয়েকবার বল হারিয়েছে, তবে রক্ষণে তেমন ভুল করেনি। এই রক্ষণই ব্রাজিলকে পৌঁছে দিয়েছে জয়ের পথে। আর ডুবিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। ৭১ মিনিটে জার্মান পেতজেলা নিজের পজিশনে বল হারালেন, হেসুস কেড়ে নিলেন তার কাছ থেকে বল। হেসুস এরপর প্রায় চল্লিশ গজ দৌড়ে ঢুকে গেলেন ডিবক্সের ভেতর, ক্লাব সতীর্থ অটামেন্ডি বাধা দিয়েছিলেন। আটকাতে পারেননি। ফয়েথও ডাইভ দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন হেসুসের ক্রস আটকাতে, তিনিও ব্যর্থ। ফলাফল ফারপোস্টে থাকা ফিরমিনোর কাছে হেসুসের লো ক্রস, আরও একবার সহজ ট্যাপ ইন, এবার গোল ফিরমিনোর। দুই গোলের পুঁজি নিয়ে ব্রাজিলকে আর পথ হারাতে হয়নি। এরপর মেসির একটি ফ্রি কিকও ঠেকিয়ে দেন অ্যালিসন। আর্জেন্টিনা পাউলো দিবালাকে নামিয়ে অল আউট অ্যাটাকে গেলেও, একটি গোলও জোটেনি আর্জেন্টিনা ভাগ্যে।

আর্জেন্টাইনরা অবশ্য নিজেদের ভাগ্যকেও দুষতে পারে। ইকুয়েডরের রেফারি রডি জামরানোর সঙ্গে বেশ কয়েকবার বাগ বিতন্ডায় জড়িয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। হলুদ কার্ডও দেখতে হয়েছে তাকে। এর আগে ম্যাচে দুইবার পেনাল্টি পেলেও পেতে পারত আর্জেন্টিনা। ৮৩ মিনিটে একবার কর্নার থেকে অটামেন্ডিকে ধাক্কা দিয়েছলেন আর্থার, আরেকবার ৭০ মিনিটে আগুয়েরো পড়ে গিয়েছিলেন আলভেজ গায়ে বাধা পেয়ে। রেফারি অবশ্য দুইবারই নিশ্চুপ ছিলেন, ভিএআরও রেফারির সিদ্ধান্ত বদলানোর পরামর্শ দেয়নি। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা কোচ অধিনায়ক দুইজনই আলাদা করে বলেছেন দুইটি ঘটনার কথা।

বেলো হরিজন্তেতে শেষ পর্যন্ত ঘরের পুরো সমর্থনই পেয়েছে ব্রাজিল। শেষ দশ মিনিটে ব্রাজিলের প্রতিটি পাসে ‘ওলে,ওলে’ ছন্দ তুলে ব্রাজিলিয়ানরা সমর্থন জানিয়েছেন দলকে। এবারের কোপাতে বেশ কয়েকবার দুয়ো শুনেছে ব্রাজিল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও বেশ অনেকটাই সময় ধুঁকতে হয়েছে ব্রাজিলকে, কিন্তু ব্রাজিলিয়ানরা জানেন এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয়ই শেষ কথা। মারাকানার ফাইনালে আরও একবার শিরোপা ঘোরে তোলার অপেক্ষায় ব্রাজিল।

ব্রাজিল: অ্যালিসন, আলভেজ, মার্কিনহোস, সিলভা, সান্দ্রো, আর্থার, কাসেমিরো, কুতিনিয়ো, হেসুস, ফিরমিনো, এভারটন

আর্জেন্টিনা: আর্মানি, ফয়েথ, পেতজেলা, অটামেন্ডি, টালিয়াফিকো, পারেদেস, রদ্রিগো ডি পল, আকুনিয়া, মার্টিনেজ, আগুয়েরো, মেসি

Comments

comments