আমার পিতৃভূমি ‘বিক্রমপুরে’ কোনদিন না যাওয়ার আক্ষেপ এখনো আছে : শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

78
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর। ময়মনসিংহ জেলায়, ব্রহ্মপুত্র নদীর ধারে। ভারতীয় রেলে কর্মরত ছিলেন বাবা। ফলত শৈশব-যৌবন কেটেছে নানান ঠাঁইয়ে। মহাবিদ্যালয় স্তরের অধ্যয়ন কলকাতাতে, স্নাতকোত্তর স্তরে অধ্যয়ন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন শিক্ষকতা, পরে সাংবাদিকতা। প্রথম উপন্যাস ঘুণপোকা তাঁর কীর্তিপথ প্রশস্থ করে দেয়। ১৯৮৯ সালে ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য অর্জন করেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। ছোটদের জন্য অবিরাম লিখেছেন। শিশুকিশোর সাহিত্যের অনন্য কৃতির প্রতি স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৮৫ সালে তাকে অর্পণ করা হয় বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার। অনন্ত মানবজমিন ধরে অবিরাম সৃজনকর্মে এখনও হেঁটে-চলা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঢাকা আগমণের ঠিক আগে গতকাল ৯ নভেম্বর বিকেলে কলকাতা বিমান বন্দরে কথা বললেন অরুণাভ রাহারায়

শীর্ষন্দুদা, আপনাকে প্রথমেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনি ৮৩ বছরে পা দিলেন। এখন নিশ্চয়ই আপনি অনেক কচিকাঁচার দাদু। এই বয়সে এসে নিজের প্রিয় দাদুকে আর মিস করেন?

নিজের দাদুকে মিস করা বলতে ছেলেবেলায় যে শোকটা হয়েছিলো সেটা তো এখন নেই। কিন্তু কোন স্থান থেকে মানুষ যখন একটি ভালোবাসা পায় এবং সে ভালোবাসাটি অনুপস্থিত থাকে, তখন মানুষ একটা কিছু মিস করে। দাদুকে আমার এখনো মনে পড়ে এইটে হচ্ছে সবথেকে বড় কথা। আমার প্রতি তার যে সাংঘাতিক একটা পক্ষপাত সেটার কথা ভুলতে পারি না। আমার জন্য দাদুর একটি শর্তহীন ভালোবাসা ছিলো। দাদুর অনেক নাতি-নাতনী ছিলো, কিন্তু তিনি বিশেষ দুর্বল ছিলেন আমার উপর। যাই হোক, যদি বলো দাদুকে মিস করি, তা ঠিক নয়, কিন্তু তার কথা আমার খুব মনে পড়ে। এবং তখন মনটা খুব মেদুর হয়ে যায়।

বেশ কিছুদিন পর ঢাকা যাচ্ছেন। আপনার পিতৃভূমি তো বিক্রমপুর।

হ্যাঁ, ঢাকা যাচ্ছি অনেকদিন পর। এখন একটু ঘোরাঘুরি কমই হচ্ছে। খুব একটা ঘোরাঘুরি এখন করি না। সামলে নিয়েছি নিজেকে। বাড়ি থেকেও পছন্দ করছেনা ঘোরাঘুরি, ডাক্তারও বারণ করেছেন। তারপরও ঢাকা যাচ্ছি অনেকদিন পর। আমার বিক্রমপুরের পিতৃভূমিতে কখনো যাওয়া হয়নি। আমার পিতৃভূমি বিক্রমপুরে কোনদিন না যাওয়ার আক্ষেপ এখনো আছে। এটার জন্য আমার জীবনে মস্ত বড় একটা অভাববোধ হয়। জানিনা, এবার পারবো কি না। কিন্তু আরো কোন বার এসে বিক্রমপুরে আমার গ্রামটায় আমি একবার যাবো, আমার ইচ্ছে আছে। গ্রামটার নাম বানিখারা।

ঢাকা লিট ফেস্টে অংশ নেবেন। আপনার সঙ্গে প্রশ্নময় কথপোকথনে থাকছেন সাহিত্যিক ইমদাদুল হল মিলন। কেমন লাগছে?

ইমদাদুল হক মিলন আমার অনেকদিনের চেনা। খুব ভালো ছেলে। মানুষও খুব ভালো। আমি ইমদাদুল হক মিলনের বাড়িতেও একবার গিয়েছিলাম। তার ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ অসাধারণ। আমি শুনেছি এখন বাংলাদেশে সে খুব জনপ্রিয় লেখক। তাছাড়া আমাদের দেশেও ইমদাদুল হক মিলনের পাঠক অনেক আছে। এবং তার লেখা নিয়মিত ‘দেশ’, ‘আনন্দমেলায়’ ছাপা হয়। হ্যাঁ, সে আমার সাক্ষাৎকার নেবে, তার সাথে আমার কথা হবে এটা শুনে ভালো লাগছে। সে আমার খুব স্নেহের পাত্র বটে।

যে তরুণ ‘ঘুণপোকা’ লিখেছিল তাঁর সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়? এখন তাঁকে আপনি কতটা চিনতে পারেন?

যে ঘুণপোকা লিখেছিলো, সত্যিই তো, সে কোথায় গেলো। সে হারিয়ে গেলো কি না, কে জানে। তবে হ্যাঁ এটা ঠিক যে, যখন আমি ঘুণপোকা লিখেছিলাম তখন অপ্রস্তুত অবস্থায় লিখেছিলাম। ‘ঘুণপোকা’ লেখার সময় আমার জীবনে একটি সঙ্কটময় মুহূর্ত চলছিলো। তবে বরাবর আমি যেভাবে লিখি, সেভাবেই লিখেছি এটাও। লেখার সময় আমি একটি লাইন ভাবি, পুরো গল্পটা কখনো ভাবি না। ভাবতে পারি না বলতে পারো। লাইন দিয়েই শুরু করি। কখনো যদি একটি লাইন মাথায় চলে আসে এবং সেটা পছন্দের হয় সেখান থেকেই শুরু করি। এবং এরপর এগোতে থাকি। এভাবে এগোতে এগোতে কিছু একটা দাঁড়ায়। এজন্য কখনো কখনো নতুন না পুরাতন, ভালো না মন্দ এ রকম ব্যাপারটা আমি জাজ করতে পারি না। ‘ঘুণপোকা’ ওই একইভাবে লেখা।  একটি লাইন ভেবেছিলাম, এরপর ওই লাইনটা ধরে ধরে অন্ধের মতো এগোলাম, একসময় উপন্যাসটা শেষও করে ফেললাম। কি হলো না হলো, কিছুই বুঝতে পারি নি। আর ওই লেখাটা বের হওয়ার পর বেশ একটা সাড়া শব্দও হয়নি, এবং লোকে যে পড়েছে সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। ‘ঘুণপোকা’ আসলে জনপ্রিয় হয়েছে প্রকাশের অনেক দিন পর। প্রথম চার-পাঁচ বছর তো ‘ঘুণপোকা’ সম্পর্কে কোন উচ্চবাচ্যই শুনিনি।  এক আধটা মন্তব্য কানে এসেছে, এ পর্যন্তই। আমার মনে হয় তখনকার পাঠক এটা গ্রহণই করেনি, কিন্তু পরবর্তীকালে মানুষের কাছে গ্রহিত হয়েছে, এবং এটা আমার সৌভাগ্য। তবে ‘ঘুণপোকা’র যে লোকটা আমি ছিলাম সেটা তো এখন আর নেই। আমি পাল্টে গেছি অনেকটাই, এবং সরে এসেছি।  চিন্তা-ভাবনাটাও বার বার পাল্টছে, তবে হ্যাঁ, পাল্টে গেলেও আমার শব্দ চয়ন, ভাবনা-চিন্তার যে একটা ধাঁচ, সেটা তো পাল্টায় নি, সেটা এখনো আছে। তবে ঘুণপোকা আমি দ্বিতীয়বার আর পড়ি নি। ওই যে লেখা হয়েছিলো ওই পর্যন্তই। বলতে পারো সাহস পাই নি। যে কারণে ‘ঘুণপোকা’ আমার কাছে কিছুটা অচেনা উপন্যাস হয়েই আছে, কারণ উপন্যাসটিতে কি কি লিখেছিলাম, অধিকাংশই আমার মনে নেই।

অন্য খবর  ঘুরে আসুন “বাহ্রা ঘাট”

‘দূরবীন’ উপন্যাসের নায়ক ধ্রুব কাপুরুষ। অথচ তাকে সবাই ভালবাসে। এমন কি মেয়েরাও…

এটা আমার কাছেও একটা ধাঁধা। প্রথম কথা দূরবীন উপন্যাসটা কোন জনপ্রিয় উপন্যাস হওয়ার কথাই নয়। এটাকে বলতে পারো দোতালার উপন্যাস। কারণ প্রতি চ্যাপ্তারেই আমি পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে গেছি। আবার এগিয়েও এসেছি। প্রথম চ্যাপ্টার শুরু হলো পঞ্চাশ বছর আগে আর দ্বিতীয়তে চলে এলাম আধুনিক যুগে। এইভাবে কোন উপন্যাস লেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এই যে দোলাচল, এজন্যই নামটা দিয়েছিলাম ‘দূরবীন’। একপিঠ দিয়ে দেখলে কাছে, অন্যপিঠ দিয়ে দেখলে দূরে। এই উপন্যাসটা যখন লিখছিলাম তখন অনেকদূর লেখার পর বুঝতে পারছিলাম উপন্যাসটি কেউ পড়বে না। আমার মনে হচ্ছিলো এই উপন্যাসের মধ্যে প্রচুর আত্মকথন আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে দুই বাংলাতেই উপন্যাসটার ভালোই পাঠক আছে। আমি দেখি অনেকেই দূরবীনের রেফারেন্স দেয়। আমার কাছে খুব বিস্ময়কর লাগে যে, ধ্রুব’র মতো চরিত্র একটি চরিত্রকে যখন পাঠকেরা ভালোবাসে।

‘বিস্ময় আছে বলেই আমাদের সাদামাটা জীবনটা পুরোপুরি একঘেয়ে হয়ে যায়নি’ এমনই মনে করেন আপনি। বাঙালি লেখক হিসেবে আকাশছোঁয়া সাফল্য পেয়েছেন। এখন আর কিছুতে নতুন করে বিস্ময় জাগে?

অন্য খবর  খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার গল্প নিয়ে বই

বিস্ময় আমার সবসময়ই জাগে। আমাদের সমস্ত পৃথিবীটা, আমরা যে বেঁচে আছি, আমাদের চৈতন্য, এই সবকিছুই আমার বিস্ময়েই উদ্রেগ করে। জীবন আমার কাছে কখনই একঘেয়ে নয়। ঠাকুরকে আশ্রয় করার পর থেকে আমার জীবনে ধাঁচটা পাল্টে গেছে। আমি আর জীবনকে একঘেয়ে মনে করি না। এই ধরো আমরা বেঁচে আছি। আমাদের চৈতন্য, আমরা জাগ্রত অবস্থায় সবকিছু দেখছি এই ব্যাপারটিই তো বিজ্ঞানের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আমার কাছে মনে হয় চৈতন্য এমন একটা জিনিস, যা বিজ্ঞানের গবেষণার বাইরের জিনিস। যেমন একটি গ্রহ আরেকটি গ্রহকে আকর্ষণ করে তার কিন্তু ব্যাখ্যা নেই। বলা হয় মাধ্যাকর্ষণের কারণে। কিন্তু একটা Mass আরেকটি Mass কে আকর্ষণ করে এর পুরো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান এখনো দিতে পারে নি। যেমন আলোটা কি দিয়ে তৈরি, এটা আমরা জানি না। সুতরাং আমাদের চারিপাশে বিস্ময়ের অন্ত নেই। জীবন আমার কাছে একটি বিস্ময় বলেই মনে হয়। জীবন আমার কাছে একঘেয়ে নয়।

এবার গল্পের প্রসঙ্গে আসা যাক। অদূর অতীতে আপনার ‘পোকা’ গল্পটি পড়েছিলাম। একটি ছেলে বেকার ছেলে ইলেকট্রিকের কাজ শেখে। একদিন একটা পোকাকে সে মেরে ফেলে এবং তার খুব দুঃখ হয়। ইলেকট্রিকের দোকান খুলবে ভাবে। কিন্তু স্কুলে তাঁর চাকরি হয়ে যায়। স্কুলের সহকর্মীর বাড়িতে ফ্যান খারাপ হলে তার ডাক পড়ে। কিছুদিন পর আরও এক সহকর্মীর বাড়িতে সে ফ্যান সারিয়ে আসে। সে অর্থবান হয়। এসি কেনে। দেখতে পায় এসির সামনে একটি পোকাকে সে মেরে ফেলেছে। কিছু তার দুঃখ হয় না। একই ঘটনা কিন্তু রায়্যাকশন বদলে গেল।

‘পোকা’ গল্পটা আমি অনেক হেলাফেলা করে লিখেছিলাম। অনেক সময় লিখতে হয় সেভাবে লিখেছিলাম। কিন্তু মানুষের রিএকশন পেয়েছি, ব্যাপারটি আমার কাছে অন্যরকম লেগেছে।

কিছুদিন আগে সমরেশ মজুমদার আপনাকে কচ্ছপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পাশেই বসে ছিলেন আপনি…

হ্যাঁ। সমরেশ মজুমদার আমাকে বলেছেন। খরগোশ আর কচ্ছপের রেসের কথা বলেছেন। কিন্তু সাহিত্য তো আর রেসের জায়গা নয়, কে কার সঙ্গে রেস করবে? আমার সবাই নিজের স্থান থেকে যে যার মতো করে, যা সাধ্য সেটা লিখি , কিন্তু এখানে কারো সাথে কারো কমপিটিশন আছে, সেটা মনে হয় না। আর এরকম কেন থাকবে। সাহিত্য তো কোন পরিক্ষা নয় যে এখানে আমাকে প্রথম হতে হবে। সাহিত্য একটা সাধনার ব্যাপার, একটা তপস্যার ব্যাপার। এক সাধুর সাথে আরেক সাধুর যেমন কোন তুলনা নেই, সাহিত্যটাও তাই। আমি সুনীলের, সমরেশের পাশাপাশি লিখেছি। তবে সমরেশ কচ্ছপের সাথে তুলনা করে খুব খারাপ করেন নি। আমি নিজেকে উইনার বলি না। তবে এটা ঠিক যে আমি একটু ধীরে ধীরে , যেমন ‘ঘুণপোকা’ বের হওয়ার অনেক পরে সাড়া পেয়েছি তেমন ধীরে ধীরে। আমাকে অনেক অপেক্ষা করে থাকতে হয়েছে অনেক ধীরে ধীরে এগোতে হয়েছে এটা সত্য। কাজেই কচ্ছপের সাথে তুলনা দিয়ে ভালোই করেছে। তবে উইনার হিসেবে দেখলে আমি দুঃখ পাবো, কারণ আমি উইনার নই, বলতে পারো সামান্য একটু জায়গায় অবস্থান করার সুযোগ পেয়েছি, এতটুকুই।

শ্রুতিলিখন: অহ নওরোজ

Comments

comments