অলৌকিক বার্নে জার্মান-জাগরণ

20
অলৌকিক বার্নে জার্মান-জাগরণ
বিজ্ঞাপন

বার্নের অঝোর বৃষ্টিও আড়াল করতে পারছে না একটু দূরের ওই ট্রফিটা। এতোই কাছে, হাত বাড়ালেই যেন তা ছুঁতে পারবেন পুসকাসরা। ১৯৫৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র ১০ মিনিট হয়েছে, এর মধ্যেই দুই গোল দিয়ে বসেছে হাঙ্গেরি। সেই হাঙ্গেরি, বিশ্বকাপের আগের চার বছর যারা কোনো ম্যাচ হারেনি। সেই হাঙ্গেরি, কদিন আগেই ফাইনালের প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানিকে যারা উড়িয়ে দিয়েছিল ৮-৩ গোলে। সেই হাঙ্গেরি, যারা ওয়েম্বলিতে এসে ফুটবলের অ-আ-ক-খ শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। তাও এমন এক জার্মানির সঙ্গে, চার বছর আগেও যাদের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি। এরপর যা হলো, সেটা নস্ট্রাডামুসও আগে থেকে অনুমান করতে পারতেন না। এরপর যা হয়েছে, সেটা আসলে সম্ভব শুধু ফুটবলেই।

অলৌকিক বার্নে জার্মান-জাগরণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেও জার্মানির ফুটবল একদম ঠিক পথেই ছিল। ১৯৩৪ বিশ্বকাপেও তৃতীয় হয়েছিল জার্মানরা। এরপর টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত ছিল তারা। ১৯৩৮ বিশ্বকাপের শুরুটা অবশ্য ভালো হলো না, বাদ পড়ে গিয়েছিল প্রথম রাউন্ড থেকেই।

এরপর রণডঙ্কা বাজল বিশ্বকাপের। বলের বদলে খেলোয়াড়দের হাতে উঠল রাইফেল, গোলপোস্টের বদলে লক্ষ্য হলো শত্রুপক্ষের ট্রেঞ্চ। এক মুহূর্তে ছন্নছাড়া হয়ে গেল জার্মান ফুটবল দল। আগের তিন বছর এই দলটাই আগলে রেখেছিলেন কোচ সেপ হেরবার্গার। যুদ্ধ শুরুর পর চেষ্টা করেছিলেন ফুটবলারদের একটু কম ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পাঠাতে। কিন্তু সব সময় তাতে লাভ হয়নি। এডলফ আরবানের যেমন ভাগ্য ততটা ভালো ছিল না। শালকের এই তরুণ স্ট্রাইকার ছিল দারুণ সম্ভাবনাময়, ১৯৪২ সালে লিগও জিতেছিল। কিন্তু সেবারের কাপ ফাইনালের পরেই তার পোস্টং হয় স্টালিনগ্রাদে। সেই স্টালিনগ্রাদ থেকে দুই পক্ষ মিলে প্রায় ২০ লাখ লোক আর কখনো ফেরেনি, আরবান ছিল তাদের একজন।

যুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু ফুটবলের তছনছ হয়ে বাগানে আর ফুল ফুটল না। যুদ্ধের পর অনেক দিন পুরনো ফুটবল ক্লাবগুলো নিষিদ্ধ ছিল, ফুটবলাররাও বেছে নিয়েছিলেন বিকল্প পেশা। এরপর আবার জার্মান ফেডারেশন পুনর্গঠিত হয় পাক্কা ১৯৪৯ সালে এসে। পরের বছর ফিফার অনুমোদন পায়, জাতীয় দলের হাল ধরেন সেই হেরবার্গার। ১৯৫০ সালের নভেম্বরে অনেক বছরের মধ্যে প্রথম প্রীতি ম্যাচ খেলে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। সেই ম্যাচ জার্মানি জিতেছিল ১-০ গোলে। তবে জার্মানির ফুটবলের চলার পথে অপেক্ষা করছিল বিস্তর কাঁটা। তুরস্ক ও আয়ারল্যান্ডের কাছে হারতে হলো। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পার হলো ধুঁকতে ধুঁকতে, কোনোমতে সারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে।

অলৌকিক বার্নে জার্মান-জাগরণ

হাঙ্গেরি তখন ইউরোপ তো বটেই, গোটা বিশ্বের ফুটবল সিংহাসনেই মহাসমারোহে অধিষ্ঠিত। সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল বেশ আগেই। ১৯১২ সালেই তারা অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেছিল, ১৯৩৮ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠে হেরে গিয়েছিল ইতালির কাছে। তবে হাঙ্গেরির সোনালী প্রজন্ম তাদের আগমনীবার্তা জানিয়েছিল ১৯৪৭ সালের দিকে।

অন্য খবর  সিটিকে হারিয়ে দুইয়ে আর্সেনাল

ফেরেঙ্ক পুসকাস ও নানদর হিদেকুতির অভিষেক হয়েছিল ১৯৪৫ সালে, স্যান্ডর ককসিসের ৪৮ ও জোলতান চিবরের তার পরের বছর। তবে হাঙ্গেরি দল হিসেবে খেলা শুরু করল ১৯৫০ সাল থেকে। জনপ্রিয় ইংলিশ ধাঁচ বাদ দিয়ে তারা নতুন একটা কৌশ উদ্ভাবিত করে। প্রথাগত স্ট্রাইকার বলে কিছু আর থাকল না, হিদেকুতি খেলতে শুরু করলেন ‘তেরাকুয়ারিস্তা’ হিসেবে। ছক কষে হুট করে পজিশন বদলে ফেলতে লাগলেন, প্রতিপক্ষ তাই তাদের কোনো পরিকল্পনাও করতে পারছিল না। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত ৩০টি ম্যাচে হারেনি হাঙ্গেরি, এর মধ্যে আরেকবার অলিম্পিকের সোনা এসেছে ট্রফিকেসে। বিশ্বকাপ বাছাইও পেরিয়েছে কোনো কিক না করেই, বাছাইয়ের প্রতিপক্ষ পোল্যান্ড যে আগেই নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিল! তবে হাঙ্গেরি কতটা ভয়ঙ্কর, সেটা বোঝাল ইংল্যান্ডে। ওয়েম্বলিতে এসে ইংলিশদের অহম ভেঙে হারাল ৬-৩ গোলে, এরপর বিশ্বকাপের আগে বুদাপেস্টে ডেকে এনে ৭-১ গোলের ‘অপমানে’ ডোবাল। বিশ্ব জানল, অনাগত চ্যাম্পিয়নরা এসে গেছে।

কী অদ্ভুত, গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরি ও পশ্চিম জার্মানিও একই গ্রুপে। সেখানে তাদের সঙ্গী তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়া। সেবার নিয়মটা ছিল অদ্ভুত। দুই বাছাই দল হাঙ্গেরি ও তুরস্ক একে অন্যের মুখোমুখি হবে না। তেমনি দুই অবাছাই জার্মানি-কোরিয়াও খেলবে না নিজেদের মধ্যে। তার মানে প্রতিটি দল খেলবে দুইটি করে ম্যাচ। কোরিয়া নিশ্চিতভাবে দুইটি ম্যাচ হারবে, সেটা মোটামুটি অনুমান করার পর হিসেবটা হয়ে গেল সহজ। হাঙ্গেরি তো দুইটি ম্যাচ জিতবেই, সেক্ষেত্রে তুরস্ক ও পশ্চিম জার্মানির ম্যাচটাই হয়ে যাবে গ্রুপ পর্বের অলিখিত ফাইনাল।

প্রথম ম্যাচেই মুখোমুখি দুই দল। জার্মানি সুযোগটা হাতছাড়া করল না, প্রথমে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত জিতল ৪-১ গোলে। হাঙ্গেরির সঙ্গে ম্যাচে হেরবের্গের এসে চমকে দিলেন, প্রথম একাদশের বেশ কয়েকজনক বিশ্রাম দিয়ে দিলেন। ফল যা হওয়ার তাই-ই হলো, হাঙ্গেরি উড়িয়ে দিল ৮-৩ গোলে। তবে পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথে ওই ম্যাচটা ভূমিকা রাখল অন্যভাবে। জার্মানির ভেরনার লিবেরিখের ট্যাকলে অ্যাঙ্কলের হাড়ে ফাটল হলো পুসকাসের। পরের দুই ম্যাচ আর খেলতেই পারলেন না গ্যালোপিং মেজর।

কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে ৪-২ গোলে হারানোর পর হাঙ্গেরির প্রথম বড় পরীক্ষা এলো সেমিফাইনালে। উরুগুয়ের সঙ্গে খেলাটা ২-২ গোলে গড়ানোর পর গেল অতিরিক্ত সময়ে, সেখান থেকে হাঙ্গেরি জিতল ৪-২ গোলে। অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানি কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোস্লাভিয়াকে ২-০ গোলে হারানোর পর সেমিতে অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে দিল ৬-১ গোলে।

জার্মান অধিনায়ক ফ্রিটজ ওয়ালটারের জন্য ফাইনালটা ছিল একটু অন্যরকম। ১৯৪৫ সালে জার্মানির বিমানবাহিনীর যে ৪০ হাজার জন মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ওয়াল্টারও। কনভয়ে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সাইবেরিয়ায়। আসলে সাইবেরিয়া তো নয়, এ মৃত্যুর কাছে যাওয়া। সেই কনভয় ইউক্রেনে একটা জায়গায় থামে, সেখানে হচ্ছিল ফুটবল ম্যাচ। পাকেচক্রে ওয়াল্টার বলে লাথি দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান, এরপর ম্যাচ খেলতেই নেমে পড়েন। একজন গার্ড তাকে চিনে ফেলে, এ তো জার্মানির জাতীয় ফুটবলার। ছাড়া পান ওয়ালটার, সুযোগ পান জার্মানির নিজ শহর কাইজারস্লটার্নে ফেরার।

অন্য খবর  চিলির মাঠে জিতল আর্জেন্টিনা

সেই ওয়ালটার নয় বছর পর বিশ্বকাপে জার্মানির অধিনায়ক। এদিনও আরেকটা অলৌকিকের দরকার হতো তার, কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাঙ্গেরি যে দুই গোল দিয়ে বসে! ম্যাচ তখন তাদের মুঠোয়। কী অদ্ভুত, শেষ পর্যন্ত ওয়ালটারের চাওয়াটাই পূর্ণ হলো। ১০ মিনিটেই বাঁ দিকে ফাঁকা জায়গা পেয়ে যান হেলমুট রান। সেখান থেকে বল পেয়ে গোল ব্যবধান কমান ম্যাক্স মরলক। আট মিনিট পর ওয়ালটারের কর্নার থেকে রান নিজেই গোল করেন। ২-২!

এরপর শুরু হাঙ্গেরির স্বরূপে ফেরা। হিদেকুতি, ককসিসের শট লাগল পোস্টে, জার্মান গোলরক্ষক তুরেক করলেন একের পর এক সেভ। ৮৪ মিনিটে এলো জার্মানির সেই মুহূর্ত। আবারও বক্সের কিনারায় বল পেয়ে গেলেন রান। একটু বাঁয়ে ফিরলেন, এরপর নিচু শটে বল জড়িয়ে দিলেন জালে। ধারাভাষ্যকার ওয়ালটার জিমারম্যান এরপর যা বললেন, তা হয়ে গেছে জার্মানির ফুটবল পুরাণের অংশ, ‘জার্মানি এগিয়ে গেছে, আমি বোধ হয় পাগল হয়ে গেছি।’ পুসকাসের আরেকটি গোল অফসাইডের জন্য বিতর্কিতভাবে বাতিল হয়ে গেল, তুরেক করলেন আরেকটি অতিমানবীয় সেভ। জার্মানিই ম্যাচটা জিতে গেল ৩-২ গোলে।

অলৌকিক বার্নে জার্মান-জাগরণ

বুদাপেস্ট তখনও শোকে প্রায় বিহবল। রাস্তায় শুরু হয়ে গেল প্রতিবাদ মিছিল, সেটা এতোটাই উন্মত্ত ছিল দেশে ফেরার জন্য বেশ কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হলো পুসকাসদের। হাঙ্গেরির সোনালী প্রজন্ম পরের বছর খেলেছে দাপটের সঙ্গে। কিন্তু সেই বিশ্বকাপ –স্বপ্নভঙ্গের ধাক্কাটা আর কখনোই কাটাতে পারেনি। সেই পরাক্রমশালী হাঙ্গেরিকে এখন জাবর কাটতে হয় ফেলে আসা দিনের কথা ভেবে।

অলৌকিক বার্নে জার্মান-জাগরণ

আর জার্মানির জন্য তা ছিল জেগে ওঠার ডাক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় মিলিয়ে যেতে বসা জার্মান-গরিমা আবার ফিরে এলো বিপুল বিক্রমে, জার্মান ফুটবল আবার ফিরে পেল পথ। ঐতিহাসিক জোয়াখিম ফেস্ট যেটিকে বলেছেন, সত্যিকারের জার্মানির পুনর্জন্ম। এরপর আরও বিশ্বকাপ জিতেছে জার্মানি, আরও অনেক স্মরণীয় মুহুর্ত এসেছে। কিন্তু ১৯৫৪ ফাইনালের জায়গাটা একেবারেই আলাদা। এই বিশ্বকাপই যে জানে জার্মানির প্রথম সবকিছু!

অম্লান মোসতাকিম হোসেন

Comments

comments